দীপ্ত কণা | রশ্মি ভৌমিক

এক রাশ কালো চুল, হিজাবের মতো সোনিয়ার ঘুমন্ত মুখের সুন্দর্য্য ঢেকে রাখে| সোনিয়া চৌধুরী পাশ ফিরে ধীরে ধীরে তার চোখ খুললো | ভোরের পাখির মিষ্টি কিচিমিচি-শব্দে তার দুঃখী-হৃদয় কিছুটা হালকা বোধ করে| সোনিয়ার মনে দুঃখ, তার মনের কথা সে কোনোদিন বলতেই  পারলো না| আগামী সপ্তাহে দীর্ঘকালের সহকর্মী রুপেশ গুরুং, বর্তমান চাকরি ছেড়ে অন্য কাজ শুরু করছে| অন্ধকার ঘরে হাতড়ে বিছানার পাশের আলোটা জ্বালিয়ে মাথা তুলতেই দেখতে পেলো খাটো আলমিরাটার উপর তার ছোট্ট একুয়ারিয়ামে রং-বেরঙের মাছ | জানালার পৰ্দা সরিয়ে বাইরের প্রকৃতির শোভা দেখে হেসে উঠলো | দিগন্তের সীমায় রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে| পুরোভূমির  কালো কালো ডালপালাগুলি, চোখের সামনে, এক অপরূপ ছবি তুলে ধরেছে| সোনিয়া তখনি ভাবলো যে লাল-কালো সালোয়ার কুর্তাটাই রুপেশের ফেয়ারওয়েল-পার্টির জন্য সঠিক  |পার্টিটা কাজের পরে, সন্ধ্যাবেলাতে| ওরা Rubico তে গত চার বছর একসঙ্গে কাজ করেছে এবং তাদের মধ্যে একটা গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে |

রুপেশ জানতো সোনিয়া ছোটবেলা থেকে তার মা-বাবার থেকেও দিদি, নীনার সঙ্গে ঘনিষ্ট | ওদের বাবা, ঋষিকেশে, একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টের মালিক|  বাবা-মা সবসময় রেস্টুরেন্টের কাজে বেস্ত থাকতেন| সোনিয়ার দরকারে অদরকারে পাশে থাকতো দিদিই | নীনা, বিয়ের পর, দিল্লি চলে যায়| সোনিয়া অনেক সময় তাই দিদির জন্য মন খারাপ করতো| নানান হাসিঠাট্টা করে রুপেশ মন ভালো করে দিতো তার | সোনিয়া জানতো নেপাল থেকে কুড়ি বছর আগে, সপরিবারে দেরাদুনে এসে, খুব কষ্টে বড় হয়েছে রুপেশ|

বন্ধুত্ব থাকা সত্ত্বেও সোনিয়া তার মনের কিছু গভীর অনুভূতি রুপেশের কাছে প্রকাশ করতে পারেনি| অন্যদিনের থেকে আজকে সোনিয়ার কাজের ব্যস্ততা দ্বিগুন| মিটিং এ যেতে দেরি হয়ে গেলো| ঘরে ঢুকতেই, সকলের চোখ গেলো তার দিকে| সোনিয়া ফর্সা, সুশ্রী ও মাঝারি গড়নের| কাম্মেজটা সুন্দর আর সামান্য tight -ফিটিং বলে সোনিয়াকে বেশ আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল|সবার দৃষ্টি অগ্রায্য করে সে বামদিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো রুপেশের সাথে | সুপুরুষ চেহারার সঙ্গে রুপেশের দুটো কালো চোখ ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধি-দীপ্ত | মিটিংএ সোনিয়ার মন ছিল না | আগামীকাল রুপেশ মুম্বাই চলে যাচ্ছে | হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না|  গ্র্রেটিং কার্ডে কি লিখে বিদায় জানাবে তাই বারে বারে চিন্তা করছিলো|

রিলায়েন্স কর্পোরেশন-এর নারীমন পয়েন্ট অফিসে রুপেশের নতুন চাকরি | রেস্টুরেন্টে রুপেশকে ঘিরে সহকর্মীরা তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছিলো| সোনিয়া ও আরো চারজন মহিলা টেবিল-এ বসে সুস্বাদু জলখাবার উপভোগ করছে| ওরা চা, সিঙ্গারা আর পানির পকোড়া অর্ডার দিয়েছে| খাওয়া আর আড্ডা দুটোই বেশ জমে উঠেছে | হঠাৎ সোনিয়ার মোবাইল বেজে উঠলো| ওর দিদি মেসেজ করে জানালো যে ওর মায়ের শরীর খারাপ| ওদের বাবাকে কাজের সূত্রে কলকাতা যেতে হয়েছে| তাই ওর মা একদম একা আছেন| দিদিকে লিখলো ” পনেরো মিনিট-এর মধ্যে বেরোচ্ছি |” কার্ডটা আর পেন বার করে কবিগুরুর একটা পংক্তি লিখলো — ” তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলে… শুভেচ্ছা ও ভালোবাসার সঙ্গে — সোনিয়া |” টেবিল ছেড়ে উঠে, ভিড় ঠেলে রুপেশকে খুঁজতে গেলো সে|

রুপেশের হাতে কার্ডটা দেয়াতে সে ভুরুকুচঁকে সোনিয়া দিকে তাকিয়ে বললো, ” এখনই যাচ্ছিস? কিসের তাড়া পড়লো?” সোনিয়া ঢোক গিলে, ” আমাকে ঋষিকেশে যেতে হবে রে|” ওর আবেগ-ভরা চোখদুটো যেন অন্যকিছু বলতে চাইছিলো| রুপেশ সেটা লক্ষ্য করে, সোনিয়ার হাত ধরে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করলো, ” কিছু বলার ছিল কি? আমার থেকে কি লুকোচ্ছিস?” নীরবে মাথা নাড়ালো, সোনিয়া| “আচ্ছা, যাবার আগে একটা বেয়ার-হাগ্ দিবিনা?” এই বলে সোনিয়াকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরলো রুপেশ| সোনিয়ার চুলের উপর দিয়ে রুপেশের ঠোঁট  ছুঁয়ে গেলো| ক্ষনিকের উষ্ণতায় সোনিয়ার মন বিগলিত| হয়তো আরো কিছুক্ষন এভাবে থাকলে সোনিয়া কিছু বলতো| তার আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে বেজে উঠলো, মোবাইলটা | সোনিয়া দীর্ঘশাস ফেলে পিছন ঘুরে, দরজার দিকে হাঁটা দিলো| সেটা দেখে রুপেশ সহকর্মী ও বন্ধুদের থেকে বিদায় নিলো| ব্রিফকেস নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আসে, মাথাধরার অজুহাতে|

সোনিয়া ধীরে ধীরে তার গাড়ীর দিকে হাঁটছিলো, সে সময় হঠাৎ একটা পরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পেল। “দাড়াও!” ঘুরে তাকিয়ে সে চমকে উঠে |

“তুমি! এখানে কেন? আমি এখুনি ঋষিকেশ যাচ্ছি|” বিস্মিত সোনিয়া, কিছু না ভেবেই বলে উঠলো|

“আমি তোমাকে ছাড়া মরে যাবো, সোনিয়া,” অতিনাটকীয় জবাব এলো| “কিন্তু, এখন কেন … আমাদের পথ আগেই পৃথক হয়ে গেছে|” | ওর চিন্তার সূত্রকে বাঁধা দিলো ওর নাছোড়বান্দা প্রেমিকের চুমু| বাস্তবতা আর অন্তর্নিহিত আতঙ্ক মিলেমিশে তাকে বিভ্রান্ত করে তুললো — এটা কি দাসত্ব না একটা সুস্থ সম্পর্ক?

দেরাদুন থেকে ঋষিকেশ যেতে গাড়ীতে প্রায় দুঘন্টা লাগে, ট্রাফিক না থাকলে| সোনিয়া সাত নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে ঋষিকেশের দিকে রওয়ানা হয়েছে| তখন বাজে রাত আটটা| সাড়ে দশটায় ওর হোন্ডা সিটিটা ঋষিকেশের শহর এলাকায় পৌঁছলো | বাইরে তখন বেশ ঠান্ডা পরে গেছে|

“গতকাল আমার ঝোলা-ব্যাগটায় খুঁজতে গিয়ে একটা অমূল্য সম্পদ পেলাম; দেখো,” হঠাৎ করে জোর গলায় বলে উঠলো| অন্যমনস্ক হয়ে সোনিয়া ক্ষনিকের জন্য ওর দিকে তাকালো| সে একটি স্ফটিকের শঙ্খ ধরে আছে – বড় অশ্রুবিন্দুর মতো | “একটু পরে দেখছি|” বামদিক থেকে একটা উজ্জ্বল আলো দ্রুতগতিতে ওদের গাড়ীর দিকে এগিয়ে, সজোরে ধাক্কা মারলো! সঙ্গে সঙ্গে এয়ারব্যাগ বেরিয়ে সোনিয়াকে ঢেকে দিলো| একটু সামলে উঠে ওর নাম ধরে ডাকতে কোনো সাড়া পেলো না, সোনিয়া|কম্পিত হৃদয়ে তাকিয়ে দেখলো যে বড় বড় কটা চোখগুলো নির্জীব দৃষ্টিতে দূরের পানে তাকিয়ে আছে|  

রাস্তার পাশের পানের দোকানটা তখনও বন্ধ হয়নি| দোকানদার এক্সিডেন্ট দেখে তাড়াতাড়ি থানায় ফোন করে| পুলিশের গাড়ী আর এম্বুলেন্স আসতে আরো চল্লিশ মিনিট লাগলো| হোন্ডা সিটির সামনেটা  আর বাঁদিকটা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্ৰস্ত হয়েছিল| গাড়ির দরজাটা ভেঙে গেছে ট্রাকের ধাক্কায় | আহত ট্রাক ড্রাইভারটাকে স্ট্রেচার করে এম্বুলেন্সএ তুলছিলো| দেখে মনে হলো প্রচুর নেশা করেছে | একজন পুলিশ অফিসার  সহযাত্রীর বয়েস, নাম ইত্যাদি তথ্য জিজ্ঞেস করলো, সোনিয়ার  হাতে স্ফটিকের শঙ্খটা দিয়ে | তার আশঙ্কা বাস্তব রুপ নিলো যখন সহযাত্রীর মৃতদেহকে একটা সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো|

তার দিদিকে ফোন করে সব বৃত্তান্ত জানালে, নীনা শুনে কাঁদছিলো | “মাকে বলিস যে আমার বাড়ি পৌঁছতে একটু দেরি হবে |” অবশেষে, মাঝরাতে, একটা পুলিশের গাড়ী তাকে তার বাবা-মার বাড়িতে পৌঁছেই দিলো।

সদর দরজা খুলে, গেলো সে মায়ের শোয়ারঘরে | লেপের নিচে শুয়েছিলেন মা, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিলো| থের্মোমিটারে দেখলো একশোচারের উপর জ্বর| তাঁর ঠোঁট গুলো শুখিয়ে গেছিলো । সোনিয়া নুন-চিনির পানি আর আইবুপ্রোফেন ট্যাবলেট খাওয়ালো| ভেজা গামছা দিয়ে কপাল মুছিয়ে দিলো, ঘন্টা-খানেক ধরে | প্রায় রাত তিনটের পর যখন জ্বর একশো-একে নামলো, তখন কিছুটা আরাম বোধ কোরে সোনিয়ার মা ঘুমিয়ে পড়লেন|

মায়ের ঘর থেকে নিজের ঘরে যাওয়ার সময় সোনিয়ার সারা শরীর শিউরে উঠলো| মনে হলো কারুর শীতল স্পর্শ ওকে একটা ভীতিকর স্মৃতি মনে করিয়ে দিলো| আকসিডেন্টের আগের কথোপকথন, টুকরো ছবি ও কল্পনার যন্ত্রনায় নিজের ঘরে এসে বিছানায় পরে সে অঝোরে কাঁদলো| মনে পরে গেলো সে এরকম করেই কেঁদেছিলো যেদিন সুনীলদা নীনাকে দিয়েছিলো বিয়ের প্রস্তাব | সেই মাসে নীনা কলেজ পাস করে নতুন চাকরিতে নিযুক্ত হয়েছিল| সুনীলদা ওর বাবার রেস্টুরান্টে প্রায় গত দশ বছর ধরে কাজ করেছে| সুনীলদা মাঝে মাঝেই নানান কাজের অজুহাত করে ওদের বাড়ি চলে আসত| তার বড় বড় কটা চোখের অদ্ভুত চাহনি সোনিয়ার মনে সৃষ্টি করতো, অস্বস্তিকর অনুভূতি |

পরের দিন সোনিয়া জলখাবার বানিয়ে মায়ের ঘরে আসতে,  ওর মা  বললেন, “সোনা, তুমি  বরং একটু কাপড় গুলো ধুয়ে বাইরে মেলে দিও|” ছাড়া-কাপড়ের একটা উঁচু স্তুপ | সব কাপড় কেঁচে মেলতে গিয়ে  দেখলো যে ওর বাবা বাড়ি ফিরে এসেছেন| বাবাকে জড়িয়ে ধরে খানিক্ষন অঝোরে কাঁদলো সে| উনি সোনিয়ার কাছে গাড়ী আকসিডেন্টের সব বৃত্তান্ত বিস্তারিত ভাবে শুনলেন| দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “নিয়তি কি আর আটকানো যায় ?” “আগামীকাল আমি তোমাকে দেরাদুন পৌঁছে দেবো, কেমন?”

এরপর সোনিয়া স্নান করতে, জামা খোলার সময়, নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন বোধ করলো যেন কেউ ওকে লক্ষ্য করছে | আচমকা মনে পরে গেলো প্রায় আট মাস আগে, রুপেশের সঙ্গে সন্ধ্যেবেলা সিনেমা দেখতে যাবার কথা| সোনিয়াকে খুব সুন্দর লাগছিলো, লাল জামা আর উঁচু হীল পরে| ও সবে বাড়ি থেকে বেরুবে, এমন সময় হঠাৎ সুনীলদা এসে ওকে একরকম জোর করেই সব প্ল্যান বাতিল করালো|

দুপুরের খাবারের পর, সোনিয়া বিছানায় শুয়েছিল| অতীতের স্মৃতি ভিড় করলো তার মনে। সে দেখলো একটা পুরুষালী হাতে ক্যামেরা। কাছে গিয়ে বুঝতে পারলো যে ক্যামেরাটিতে একটি নগ্ন কিশোরীর ছবি তোলা হয়েছে। সোনিয়ার প্রতিবাদ এক জোরালো হুমকিতে চাপা পরে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যে, দৃশ্যটা অন্ধকার পটভূমিতে বিলীন। শরীরের উপর একটা ভারী বস্তু, তার ভিতরে প্রবেশ করছিলো। স্থানচ্যুত করার তার চেষ্টা বার বার ব্যর্থ হয়েছিল। বস্তুটা চেপে আটকে থাকলো, ওর ঊরুর উপর আঠালো রসগুলোর মতন| ভয় পেয়ে, তার গলা দিয়ে এক বর্ণ আওয়াজ বেরোলো না|

ঠান্ডা মেঝেটা ধীরে ধীরে একটা শক্ত গদিতে রূপান্তরিত হল। সে বিছানায় পাশ ফিরলো| হাতড়ে বিছানার কাছের আলোটা জ্বালালো| মাথা তুলতেই খাটো আলমিরাটার উপর তার অ্যাকোয়ারিয়ামের পাশে স্ফটিক-শঙ্খটা দেখতে পেলো | | ভোরের কিরণ তার দেরাদুনের ফ্ল্যাটের  জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছিলো। সে সাহস জোগাড় করলো –তার ভালবাসার উজ্জ্বল আলোয় মনের অন্ধকারের অবসান করবে|

মোবাইলটা নিয়ে চেনা নম্বরে কল করলো| একটু হতাশ হলো, অন্যদিকের রিং হয়ে যাওয়াতে| | হঠাৎ রুপেশের গলার আওয়াজ পেয়ে উত্তেজিত সোনিয়া, জানালার দিকে ঘুরে দাঁড়াল | তার কুনুয়ে লেগে স্ফটিক- শঙ্খটা, একুয়ারিয়ামের পায়ার পিছনে হারিয়ে গেলো | “রুপেশ, আমি আগেই বলতে চেয়েছিলাম| গত শুক্রবার সুনীলদা দেরাদুনে এসে, ঋষিকেশে যাওয়ার সময় আমার গাড়ী-দুর্ঘটনায় সুনীলদার মৃত্যু হয়|” বলতে গিয়ে ওর গলা কাঁপছিলো| সোনিয়া ঘুরে দেখলো স্ফটিক-শঙ্খটা উধাও হয়ে গেছে|

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s